বাংলাদেশের বাণিজ্য ইতিহাসে চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ – এই দুই এলাকা বহু শতাব্দী ধরে দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে শুধু স্থানীয় বাজার নয়, সমগ্র দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে এই এলাকাগুলোর চেহারা ও চরিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
পাকিস্তান আমল থেকে পাইকারি বাণিজ্যের উত্থান :
পাকিস্তান আমল থেকেই চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাণিজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। তখনকার ব্যবসায়িক পরিবেশ ছিল বিশ্বাস ও আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসায়ীর প্রতি ছিল অগাধ আস্থা। ছোট একটি সাদা কাগজে “এত বস্তা মাল বুঝিয়া পেলাম” লিখে দিলেই প্রাপ্তি রসিদ হিসেবে গণ্য হতো। বাকিতে মাল বিক্রির জন্য কোনো জামানত বা ব্যাংক চেক লাগত না। কালের পরিক্রমায় সেই আস্থার পরিবেশ প্রায় বিলীন। এখন নগদ চেক ছাড়া ব্যবসা করা যায় না। তাছাড়া শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে মাঝেমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান পালিয়ে গেছে, যার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর – যারা অল্প পুঁজি নিয়ে “ডিউ ব্যবসা” করে পরিবার চালায়।
সেকালের চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ : ঐতিহাসিক দলিল ও প্রবীণ ব্যবসায়ীদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, চাক্তাই খাল ও কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই এলাকা মূলত নদী-নির্ভর বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। নৌপথ ছিল প্রধান পরিবহন মাধ্যম – টেকনাফ, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া সহ দক্ষিণ চট্টলার সব এলাকা থেকে ছোট-বড় বোট ও সাম্পানে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্য কিনতে আসত। ভোর হলে চাকতাই-খাতুনগঞ্জ হয়ে উঠত ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা, মাঝিমাল্লার হাঁকডাকে মুখর থাকত এলাকা। চাল, ডাল, চিনি, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধান এসে মিলিং হতো স্থানীয় বড় বড় রাইস মিলে – যেমন বাগদাদ রাইস মিল, আদর্শ রাইস মিল, আমানত রাইস মিল, শাহ সুন্দর রাইস মিল, রহমানিয়া রাইস মিল, গাউছিয়া রাইস মিল ইত্যাদি।
বিশ্বাসভিত্তিক ব্যবসা ছিল এর প্রাণ। লেনদেন হতো মৌখিক চুক্তি ও হাতে লেখা প্রাপ্তি রসিদে।
একালের চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ : বর্তমানে চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ নদী-নির্ভরতা হারিয়ে মূলত সড়কপথে নির্ভরশীল। চাক্তাই খালের দূষণ ও নাব্যতা হারিয়ে নৌবাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা রোধে খালের মুখে স্লুইস গেট দেওয়ায় বড় মালবাহী বোট আর প্রবেশ করতে পারে না – ফলে ঐতিহ্যবাহী নৌবাণিজ্য স্হবির হয়ে পড়েছে। সময়ের পালাবদলে আধুনিকতার ছোঁয়া স্পর্শের কারণে খাতুনগঞ্জে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, আধুনিক গুদাম ও কম্পিউটারাইজড হিসাব-নিকাশ ব্যবস্থা। তবে আস্থার জায়গায় এসেছে চেক-নির্ভর লেনদেন। একইসঙ্গে এখানে গড়ে উঠেছে সুদি ব্যবসার বিশাল সিন্ডিকেট, যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় অনেকে “টু-টু ব্যবসা” বলেন। ডিউ বেচাকেনার আড়ালে এই ব্যবসায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুদের বোঝা শোধ করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ছে।
বর্তমানের চ্যালেঞ্জ: বিশেষ করে যানজট, অবকাঠামোগত সংকট ও জলাবদ্ধতা ব্যবসায় বড় বাধা। জোয়ার আসলেই রাস্তায় পানি উঠে যায়, এতে করে দোকান ও গোডাউনে থাকা কোটি কোটি টাকার দ্রব্য নষ্ট হয়ে যায়। অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতেও পণ্যের দাম মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। একারণে সারাদেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে।
ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের সংযোগ : পুরোনো দিনের ব্যবসায়ী ও নৌপথের প্রাণচাঞ্চল্য এখন তেমন নেই। যদিও আজ অনেক কিছু বদলে গেছে, তবুও চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ এখনও দেশের বৃহত্তম খাদ্যশস্য, তেল, চিনি, মসলা ও নিত্যপণ্যের পাইকারি সরবরাহ কেন্দ্র। কিছু পুরোনো প্রতিষ্ঠান এখনও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যা এই এলাকার ঐতিহ্য বহন করে।
সমাধানের প্রস্তাবনা: ১. চাক্তাই খালের দখলমুক্তকরণ ও নাব্যতা ফিরিয়ে এনে পুনরায় নৌবাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি। ২. যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালু। ৩. বাজার তদারকিতে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক নজরদারি, যাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি রোধ হয়। ৪. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে ঋণপ্রদান কর্মসূচি। ৫. পাইকারি বাজারে ডিজিটাল লেনদেন ও স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। ৬. পুরোনো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ ও প্রমোশনের উদ্যোগ, যাতে ব্যবসার ইতিহাস ও সংস্কৃতি টিকে থাকে।
উপসংহার : চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ কেবল একটি বাজার নয় – এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঐতিহ্যের জীবন্ত ইতিহাস। সেকালের নদীনির্ভর, আস্থাভিত্তিক ব্যবসা থেকে একালের প্রযুক্তিনির্ভর, চেক-ভিত্তিক বাণিজ্যে আসা – এটি এক দীর্ঘ বিবর্তনের ফল। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই এলাকা আবারও দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
মোঃ মঈনুল আলম ছোটন
আহ্বায়ক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।